বালুকার ঢেউগুলো দগ্ধ,
রোদ যেন মদিনার বুকে জ্বলা এক দুঃখের সলিল।
যুদ্ধ থেমেছে,
কিন্তু বাতাসে এখনো ছড়িয়ে আছে ধোঁয়া, রক্ত, আর মানবতার গন্ধ।
আবদুল্লাহ নামের তরুণ সাহাবী ধূলিধূসর মাটিতে বসে আছে—
বুকে ক্লান্তি, হাতে রক্তমাখা চামচি।
অল্প কিছু পানি আছে তাতে,
যেন মরুভূমির বুকে আটকে থাকা শেষ ফোঁটা জীবনের প্রতিশ্রুতি।
চারদিকে নিস্তব্ধতা।
শুধু করুণ গুঞ্জন,
আহতদের নিঃশ্বাসের কাঁপন—
একটি নামহীন বেদনাসঙ্গীত।
হঠাৎ চোখে পড়ে এক বৃদ্ধ সাহাবী—
তৃষ্ণায় অজ্ঞানপ্রায়।
আবদুল্লাহর হাত কেঁপে ওঠে;
নিজের শুকনো ঠোঁট ছুঁয়ে বলে—
“আমি বেঁচে থাকলেই তো ও বাঁচবে।”
কিন্তু হৃদয়ের গভীর থেকে উঠে আসে প্রিয় নবীর বাণী:
“তোমার ভাইয়ের জন্য যা চাও, তা-ই তোমার ঈমানের পরিমাপ।”
চামচি এগিয়ে দেয় বৃদ্ধের মুখের দিকে।
বৃদ্ধ চোখ মেলে শুধু বলেন—
“না, ওই তরুণটাকে দাও... ওর অবস্থা আমার চেয়ে খারাপ।”
বৃদ্ধের ঠোঁটেও ঈমানের তৃষ্ণা—
জলের নয়, ত্যাগের।
চামচি ঘুরে যায় দ্বিতীয় জনের হাতে।
সে কষ্টে হাসে, রক্তমাখা বুকে হাত রাখে—
“ওই শেষজন... ওকে দাও... ও বেশি তৃষ্ণার্ত।”
আবদুল্লাহ ছুটে যায়—
কিন্তু পৌঁছাতেই দেখে,
তৃতীয় জনের চোখে আর আলো নেই।
সে চলে গেছে,
অবশ মুখে যেন বলছে—
“তৃষ্ণা মিটে গেছে, ভাই... আল্লাহর সান্নিধ্যে।”
ফিরে এসে আবদুল্লাহ দেখে,
দ্বিতীয়জন নিথর,
বৃদ্ধ শান্ত নিদ্রায় শায়িত—
তিনটি শরীর, তিনটি প্রাণ,
এক ফোঁটা পানির জন্য কেউ নিজেকে অগ্রাধিকার দেয়নি।
আবদুল্লাহর চোখে পানি এল, ঠোঁট শুকনোই রইল।
আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল সে—
“হে প্রভু, এ কেমন ভালোবাসা তুমি মানুষের মাঝে রেখেছো,
যা তৃষ্ণাকেও হার মানায়,
যা মৃত্যুকেও মিষ্টি করে তোলে?”
সন্ধ্যার সূর্য তখন নিভে যাচ্ছে,
বালুর ওপরে তিনটি ছায়া—
শান্ত, জ্যোতির্ময়, ঈমানের।
তাদের চোখে আর তৃষ্ণা নেই,
শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির ছায়া।